মডেল: মেধা।
শাহিনুর আলম কলি
রমজানে বদলে যায় জীবনধারা। অনেকেরই অফিস সময় বদলে যায়, বদলায় ছোটদের স্কুলের সময়ও। লাইফস্টাইলের সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন খাবার এবং ঘুমের রুটিনেও পরিবর্তন আসে। এই বদলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অনেকের সময় লেগে যায়। দেহমনে আসে অবসন্নতা। সব দিক সামলে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বজায় রাখা আসলেই ঝক্কির কাজ। তাই শারীরিক সুস্থতার জন্য রমজানে উচিত সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, রুটিন অনুসারে দৈনন্দিন কাজের প্রতি যত্নশীল থাকা। প্রথম দিকে মানিয়ে নিতেও বেশ অসুবিধা হয়। তবে পরিকল্পনা থাকলে স্বাস্থ্যসম্মত রমজান উপভোগ করা যায়।
খাবার যেমন হবে
আমরা কী খাবার খাচ্ছি তার ওপর নির্ভর করে রমজানে ফিট ও সুস্থ থাকার বিষয়টি। ইফতার এবং সাহরিতে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ নজর দিতে হবে। রোজায় সারা দিন না খেয়ে থাকার ফলে শরীরে যেসব ঘাটতি তৈরি হয়, সেসব পূরণে প্রোটিন খাওয়া জরুরি। সে ক্ষেত্রে ছোলা, চিকেন, হালিম, কাবাব বা ডিমের তৈরি খাবার খেতে পারেন।
বাইরের জুস না কিনে দেশি ফল দিয়ে ঘরেই জুস তৈরি করে নিতে পারেন। বাজারের হালিম বা জিলাপির বদলে ঘরে তৈরি হালিম এবং পায়েস বা মিষ্টি খেতে পারেন। আর যারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তারা ইসবগুলের ভুসি খেতে পারেন। এক্ষেত্রে সরাসরি ফলের রস বা জুস খেতে পারবেন না। আর কিডনি রোগে আক্রান্ত সবাইকে কিন্তু ছোলা, ডাল, বেসন এসব বাদ দিতে হবে।
ইফতারিতে পানির চাহিদা বেশি থাকে, তাই এ সময় এমন কিছু পানীয় রাখার চেষ্টা করতে হবে
এ ছাড়া খাদ্যতালিকায় আয়রনজনিত খাবারগুলো খেতে হবে। সঠিক খাদ্যাভ্যাসে অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ না খেয়েও রক্তস্বল্পতা দূর করা যায়। খাবারে ছোটদের জন্য প্রোটিন জাতীয় খাবার পর্যাপ্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। বয়স্ক সদস্যদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার রাখার চেষ্টা করতে হবে। ইফতার ও সাহরিতে ঘরে বানানো খাবার খেতে হবে। বাইরের বাসি বা পোড়া তেলে ভাজা খাবার অ্যাসিডিটি বাড়াতে পারে। তাই এ সময় স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে সুস্থ থাকতে হবে।
পানি পান
ইফতারিতে পানির চাহিদা বেশি থাকে, তাই এ সময় এমন কিছু পানীয় রাখার চেষ্টা করবেন যেগুলো আপনার পিপাসা মেটানোর পাশাপাশি শরীরে শক্তি জোগাবে। রোজাতে প্রতিদিন কমপক্ষে আড়াই লিটার পানি পান করুন। ইফতারিতে শরবত হিসেবে অল্প চিনিযুক্ত লেবু পানি, মিষ্টি ফলের রস, ডাবের পানি, মিল্কশেক, লাচ্ছি এগুলো রাখতে পারেন। সাহরিতে অতিরিক্ত পানি খেলে পেটে অস্বস্তি হতে পারে এবং হজমের সমস্যাও হতে পারে। তাই এই সময় ধাপে ধাপে তিন গ্লাস পানি পান করতে পারেন। চাইলে ফলমূল খেতে পারেন। এতে পানির ঘাটতি দূর হবে। সাহরির সময় চা-কফি না খাওয়াই ভালো।
সাহরি যেমন হবে
রোজায় কোনোভাবেই সাহরি খাওয়া বাদ দেওয়া যাবে না বরং সাহরিতে খেতে হবে সবচেয়ে বেশি খাবার। সাহরিতে ভাতের সঙ্গে সবজি, মাছ অথবা মুরগির মাংস খাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া দুধ-কলা-ভাত খেতে পারেন। ভাত, সবজি ও মাছ খাওয়ার পর এক কাপ দুধ ও খেজুর খেলে সারা দিনের পানিশূন্যতা রোধ করতে সাহায্য করবে।
ইফতারি যেমন হবে
পানি দিয়ে ইফতার শুরুর পর খেজুর ও কিছু ফল খাওয়া উচিত। খাওয়ার সময় আপনার ঐতিহ্যবাহী খাবারই খান, কিন্তু সেখানে যেন প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও সবজি থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। স্যুপ, মাছ বা মুরগির মাংসের আইটেম থাকতে পারেন। সহজপাচ্য খাবার হিসেবে মুড়ি, চিড়া, দই, খই অথবা সবজি দিয়ে বানানো নুডলস ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া মৌসুমি ফল ও সালাদ স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, যা ভিটামিন ও মিনারেলের চাহিদা পূরণ করতে সাহায্য করবে। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, তেল, মসলা, সাদা চিনি, রাস্তার ফাস্টফুড এড়িয়ে চলতে হবে।
ব্যায়াম
বিশেষজ্ঞদের মতে, রমজানে সুস্থ থাকতে খাবার ও পানির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি হালকা ব্যায়াম অথবা ইয়োগা করতে পারেন। যতটা সম্ভব বিশ্রামে থাকতে হবে। বিকেলের দিকে শরীরচর্চা না করাই ভালো। ফজরের নামাজের পরের সময়টায় ব্যায়ামের জন্য আদর্শ সময়। আধঘণ্টা হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। তবে চেষ্টা করুন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটতে। এতে শরীর ও মন দুটোই চাঙ্গা থাকবে। রাতেও ব্যায়াম করতে পারেন। তবে খাওয়ার পর ১-৩ ঘণ্টা বিরতি দিয়ে শরীরচর্চা করা করা ভালো। এই ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুললেই শরীরটা ‘ফিট’ থাকবে।
ঘুমের সময়
রোজার সময় সুস্থ থাকতে সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মতো পর্যাপ্ত ঘুম খুব গুরুত্বপূর্ণ। রমজানে তারাবির নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতে আলাদা সময় দেওয়া হয়। শেষ রাতে ঝটপট উঠে যাওয়ার তাড়াও থাকে। সব মিলিয়ে ঘুমের সময়টা কমে যায়। ঘুম ঠিক রাখতে আনুষঙ্গিক কাজকর্ম কমিয়ে আনুন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কম সময় ব্যয় করুন। তাই রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ুন। ৪টার সময় উঠে সাহরি খেয়ে ফজরের নামাজ পড়ে ভোর ৬টায় আবার ঘুমিয়ে নিতে পারেন। তাহলে সাহরির আগে চার ঘণ্টা এবং পরে দুই ঘণ্টা মিলিয়ে মোট ছয় ঘণ্টা ঘুমাতে পারবেন। সুযোগ থাকলে দিনেও খানিকটা ঘুমিয়ে নিতে পারেন। এতে ক্লান্তিভাব কমে যাবে।
রোজায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা
রমজানের সময় হতে হবে বেশি সচেতন। স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নিতে হবে। ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানির রোগীদের জন্য নিয়মিত ওষুধ প্রয়োজন। তারা রমজানে সেগুলো কী মাত্রায় গ্রহণ করবেন, সেটা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগেই জেনে নিতে পারেন। বিশেষ করে যারা ইনসুলিন নেন, তাদের ডোজ ও সময় ঠিক করে নিতে পারেন। যাদের রমজানে বিশেষ ধরনের খাদ্য পরিকল্পনা প্রয়োজন। তারা সেক্ষেত্রে পুষ্টিবিদের কাছ থেকে খাদ্যতালিকা করিয়ে নিতে পারেন।
ত্বকের যত্ন
রমজানে পানি কম পান করা হয় বলে পানিশূন্যতায় ত্বকের আর্দ্রতা কমে গিয়ে ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়ে। ত্বকে আর্দ্রতা বাড়ানোর জন্য মুখ-হাত-পা ধুয়ে ভারী ক্রিম বা লোশনে অল্প পানি মিলিয়ে ব্যবহার করতে পারেন। এতে আর্দ্রতা থাকবে ৩-৪ ঘণ্টা। এ ছাড়া পানিশূন্য ত্বকে নিয়মিত কাঠবাদাম বাটা, ঠাণ্ডা দুধ ও গোলাপ জল দিয়ে তৈরি ফেসপ্যাক ব্যবহার করতে পারেন। এটি শুষ্ক পানিশূন্য ত্বকের জন্য খুবই উপকারী। যাদের ত্বক বেশি শুষ্ক, তারা টমেটো, কলা, শসা একসঙ্গে মিলিয়ে প্যাক তৈরি করে ইফতারের ঘণ্টাখানেক পর লাগিয়ে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের শুষ্কতা দূর হবে।
নারীর জন্য সময়
কর্মজীবী নারীরা সারা দিন রোজা থেকে অফিস, সংসার সামলাতে গিয়ে শারীরিক এবং মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। যা নিজের এবং পরিবারের উভয়ের জন্যই ক্ষতি। তাই পরিবারের অন্য সদস্যদের উচিত মানুষটিকে সহযোগিতা করা। তার কাজের চাপ কম থাকলে সে সুস্থ থাকবে, তার সঙ্গে পরিবারের অন্য সবাই সুস্থ এবং হাসিখুশি থাকতে পারবে।
কমেন্ট বক্স